Skip navigation


লাঞ্চের পর আবারও আমাদের ডাল্টন স্যারের সাথে ক্লাস ছিল।এবার ইতিহাস। আমরা দ্বিতীয় বিশ্ব-যুদ্ধ নিয়ে পড়ছিলাম। এতে আমার খুব বেশি আগ্রহ ছিল না কিন্তু স্টীভ খুবই পছন্দ করতো। যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং মারামারি সংক্রান্ত সব কিছুতেই স্টীভের প্রচন্ডরকম আগ্রহ ছিল। ও প্রায়ই বলত যে বড় হয়ে ও ভাড়াটে সৈনিক হবে, টাকার জন্য লড়াই করবে। আসলেই ও ওটা হতে চাইত!

ইতিহাসের পর আমাদের অংক ক্লাস ছিল, এবং অবিশ্বাস্য ভাবে তৃতীয়বারের মত সেটাও পড়াতে এলেন ডাল্টন স্যার! আমাদের অঙ্কের শিক্ষক অসুস্থ হয়ে স্কুলে আসতে পারছিলেন না, সুতরাং অন্যান্য শিক্ষকরা যে যখন পারতেন, উনার ক্লাসগুলো ভাগ করে নিয়ে নিতেন।

স্টীভ তো খুশীতে স্বর্গের সাত-তলায়! পর পর তিনটা ক্লাস তার প্রিয় শিক্ষকের! এই প্রথম ডাল্টন স্যার আমাদের অংক ক্লাস নিলেন। স্টীভের ‘ভাব’ আর দেখে কে! আমরা বইয়ের কোথায় আছি, কঠিন অংকগুলো কি ভাবে করতে হবে, স্টীভ এগুলো স্যারকে এমন ভাবে দেখিয়ে দিচ্ছিল যেন কোন বাচ্চা ছেলেকে শেক্ষাচ্ছে। কিন্তু মনে হল স্যার তাতে কিছু মনে করেন নি। তিনি স্টীভকে ভাল ভাবেই বুঝতেন, আর এ ও বুঝতেন ওকে কি ভাবে বশে রাখা যায়।

সাধারনত ডাল্টন স্যার ক্লাসে বেশ কড়া হলেও মজা করে পড়াতেন এবং আমরা সব সময়ই নতুন কিছু না কিছু শিখতাম। কিন্তু তিনি অংকে ভাল ছিলেন না। আমাদের অংক বোঝানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন কিন্তু আমরা বুঝতে পারছিলাম যে সমস্ত অংক উনার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। অংক বইয়ে মুখ গুঁজে তিনি যখন অংক বোঝার চেষ্টা করছেন আর পাশ থেকে স্টীভ উপদেশ দিচ্ছে, তখন আমরা অন্যরা অস্থির হয়ে ফিসফিস করছিলাম এবং পুরোদমে নোট চালাচালি শুরু করে দিলাম।

আমি এলানকে একটি নোট পাঠিয়ে জানতে চাইলাম, ওই রহস্যময় কাগজ সে কোথা থেকে যোগাড় করেছে। প্রথমে কিন্তু ও এ ব্যপারে আমাকে কোন কিছু লিখতে চাইলো না, কিন্তু আমি বারবার নোট পাঠানোতে অগত্যা হার মানল। টমি ওর দুই সীট পরে বসেছিল সুতরাং টমিই প্রথমে কাগজটা পেলো এবং খুলে পড়া শুরু করে দিল। আমি দেখলাম প্রথমে ওর মুখ উজ্জ্বল হয়ে, পরে ধীরে ধীরে মুখ পুরো হা হয়ে গেল। তিনবার পড়ার পর ও যখন আমাকে দিল, তখন কারনটা বুঝতে পারলাম।

ওটা ছিল একটি ফ্লায়ার। কোন একটা ভ্রাম্যমান সার্কাস দলের বিজ্ঞাপনী প্রচারপত্র, যেটার সবচেয়ে উপরে একটি নেকড়ে বাঘের মুখের ছবি- বিরাট হা’র ভিতর দা্ঁত, আর তা থেকে লালা ঝরছে। সবচেয়ে নিচে একটি মাকড়শা এবং একটি সাপের ছবি ছিল, এবং ওগুলোও দেখতে ভয়ংকর।

নেকড়ের ঠিক নীচে লাল অক্ষরে বড় বড় লেখাঃ

সার্ক দু ফ্রিক

আর তার ঠিক নীচে ছোট করে লেখা,

শুধু মাত্র এক সপ্তাহের জন্য! সার্ক দু ফ্রিক!

দেখুন:
সিভ এবং সীরসা – প্যাঁচানো জমজ!
সর্প-বালক! নেকড়ে-মানুষ! গার্থা টীথ!
লার্টেন ক্রেপ্সলি এবং তার অভিনব মাকড়শা!
ম্যাডাম অক্টা! আলেকজান্ডার রিবস্! দাড়িওয়ালা মহিলা!
হ্যান্স হ্যান্ডস! রেমাস টুবেলিস-বিশ্বের সবচেয়ে মোটা মানুষ!

আর এই সব লেখার নীচে একটা ঠিকানা দেয়া যেখান থেকে টিকেট কেনা যাবে। প্রদর্শনী স্থানের ঠিকানাও ওখানে দেয়া ছিল। এবং নীচে যেখানে সাপ এবং মাকড়শার ছবি, তার ঠিক উপরে লেখা:

দুর্বল মনের মানুষের জন্য নয়! বিধি নিষেধ প্রযোজ্য!

‘সার্ক দু ফ্রিক?’ আমি বিড় বিড় করে বললাম। সার্ক হল সার্কাসের ফ্রেঞ্চ…ফ্রিকের সার্কাস …এটা কি একটা অস্বাভাবিক মানুষদের প্রদর্শনী? দেখে তো তাই মনে হচ্ছে!

আমি আর একবার ফ্লায়ারটা পড়া শুরু করলাম। সার্কাস খেলোয়ারদের ছবি এবং বনর্নায় বুঁদ হয়ে ছিলাম। সত্যি বলতে কি, এতটাই মগ্ন হয়ে ছিলাম যে ক্লাসে স্যারের উপস্থিতির কথা একেবারেই ভুলে গেছিলাম। আমার তখনই স্যারের কথা মনে পড়লো যখন দেখলাম সমস্ত রুম চুপ। মাথা তুলে তাকিয়ে দেখি ক্লাসে্র একেবারে সামনে স্টীভ একা দাঁড়িয়ে। আমার দিকে তাকিয়ে জিভ বের করে দাঁত কেলিয়ে হাসছে। আর তারপরই আমার ঘাড়ের কাছের লোম দাঁড়িয়ে যেতে আমি ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখি স্যার এতক্ষন আমার পিছনে দাঁড়িয়ে চুপ করে ফ্লায়ারটা পড়ছিলেন।

আমার হাত থেকে কাগজটা প্রায় কেড়ে নিতে নিতে বললেন, ‘কি এটা’?

-এটা প্রচারপত্র, স্যার।

-পাইছিস কোথায়? দেখে মনে হচ্ছিল তিনি প্রচন্ড রেগে গিয়েছেন। উনাকে আগে কখনোই এতটা রাগতে দেখিনি।

-কোথায় পাইছিস? তিনি আবারও জিজ্ঞাসা করলেন।

ভয়ে ঠোঁট কামড়ালাম। বুঝতে পারছিলাম না কি উত্তর দেবো। আমি মরে গেলেও এলানের নাম বলব না, আর এটাও জানি এলানও নিজে থেকে কখনোই স্বীকার করবেনা। আমরা, এলানের সবচেয়ে কাছের বন্ধুরা জানি যে এলান কতটা ভীতু। কিন্তু আমার মাথা ভয়ে ঠিকমত কাজ করছিলনা তাই চট করে একটা মোক্ষম মিথ্যা বানাতে পারছিলামনা।

ভাগ্যক্রমে স্টীভ হাল ধরল, ‘স্যার, ওটা আমার’।

স্যার চোখ পিট পিট করে বললেন, ‘তোর’?

-বাস স্ট্যান্ডের কাছে পাইছি স্যার, একটা বুড়া লোক ফেলে দিয়েছিল। কি আছে দেখার জন্য তুলে এনেছি। ক্লাস শেষে এইটা সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম।

-ওহ্ তাই!

স্যার খুশী-খুশী ভাব চেপে রাখার চেষ্টা করলেও আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম যে তিনি মনে মনে ঠিকই খুশী হয়েছেন।

-তা হলে তো অন্য কথা। জানার ইচ্ছে থাকা ভাল। যা, বস।

স্টীভ বসল আর ডাল্টন স্যার ফ্লায়া্রটাকে একটা থাম্বট্যাক দিয়ে বুলেটিন বোর্ডে গেঁথে রাখলেন।
ফ্লায়ারটার উপর টোকা দিতে দিতে বললেন, ‘অনেক আগে, আসল ফ্রিক প্রদর্শনী হত। ঠগ, লোভী লোকরা বিকলাঙ্গ মানুষদেরকে খাঁচায় ভরে রাখত…’

-স্যার, বিকলাঙ্গ মানুষ মানে কি? কে যেন প্রশ্ন করল।

-যেমন কোনো একজন মানুষ যে দেখতে অন্য আট-দশজন সাধারন মানুষের মত না। যেমন তিন হাত অথবা দুই নাকওয়ালা মানুষ; পা নাই এমন কেউ; খুব খাট বা খুব লম্বা মানুষ। ঠগরা এই সব মানুষদেরকে খাচায় পুরে অন্য সাধারন মানুষদেরকে দেখাতো এবং বলতো ওরা নাকি ‘ফ্রিক’, অর্থাৎ উদ্ভট। অথচ এদের এই শারীরিক ত্রুটি বাদে সবই আমাদের মত। ঠগরা এই সব ‘বিকলাংগ মানুষ বা ফ্রিকদের দেখিয়ে সাধারন মানুষদের কাছ থেকে পয়সা নিত। ফ্রিকদের নিয়ে ঠাট্টা করতে দিত। ওরা ফ্রিকদের সাথে পশুর মত ব্যাবহার করতো। খুব অল্প পয়সা দিত, মারত, ছেঁড়া কাপড়ে পরতে দিত আর গোসল করার অনুমতিও দিত না।

-কি নিষ্ঠুর! সামনের দিকে বসা ডেলাইনা প্রাইস নামের মেয়েটা বলে উঠল।

-হ্যাঁ। ফ্রিক শো খুব নিষ্ঠুর এবং জঘন্য প্রদর্শনী। তাই এটা দেখে রেগে গেছিলাম।

ফ্লায়ারটা ছিড়ে ফেলতে ফেলতে বললেন। ‘ফ্রিক প্রদর্শনী অনেক বছর আগে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কিন্তু প্রায়ই গুজবে শোনা যায় যে এখনও ওরা তৎপর আছে’।

-আপনি কি মনে করেন যে সার্ক দু ফ্রিক আসলেই ফ্রিক শো? আমার জিজ্ঞেস করলাম।

স্যার আবার ফ্লায়ারটা পড়লেন। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘মনে হয় না, এটা সম্ভবত একটা বাজে ধরনের চালাকি’। কিছু থেমে আবার বললেন ‘আর যদি সত্যিই হয়… আমি আশা করি আমাদের মাঝে কেউ এটা দেখতে যাওয়ার চিন্তা করবে না।’

-না স্যার, না। আমরা সবাই বেশ তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম।

-কারণ ফ্রিক শো খুবই অমানবিক। ওরা আসল সার্কাসের মত হবে বলে ভাব ধরলেও, আসলে শয়তানীর আড্ডা। আর যারা ওখানে যায়, তারাও ওদের মতই খারাপ।

স্টীভ বলে উঠল- ‘ওখানে শুধু প্রচন্ডরকম বিকৃ্ত মানসিকতার মানুষরাই যেতে পারে।’

আর তারপর আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে ইশারায় বললঃ ‘আমরা যাচ্ছি!’

চলবে…

Advertisements

3 Comments

  1. অনুবাদ ভাল হচ্ছে ।তবে কোথায় যেন একটু ঘাটতি দেখা যায় ।সমস্যা নেই নির্দ্বিধায় চালিয়ে যান ।

    • আলোর ছোয়া
    • Posted January 13, 2011 at 4:10 pm
    • Permalink
    • Reply

    চালিয়ে যান ।৪ দিলাম ।

  2. আমি বাচ্চাদের নিয়ে গল্প লেখা শুরু করেছি । পাঠক পছন্দ করছে ।আমারও ভাল লাগছে ।


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: