Skip navigation

Monthly Archives: June 2010


লাঞ্চের পর আবারও আমাদের ডাল্টন স্যারের সাথে ক্লাস ছিল।এবার ইতিহাস। আমরা দ্বিতীয় বিশ্ব-যুদ্ধ নিয়ে পড়ছিলাম। এতে আমার খুব বেশি আগ্রহ ছিল না কিন্তু স্টীভ খুবই পছন্দ করতো। যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং মারামারি সংক্রান্ত সব কিছুতেই স্টীভের প্রচন্ডরকম আগ্রহ ছিল। ও প্রায়ই বলত যে বড় হয়ে ও ভাড়াটে সৈনিক হবে, টাকার জন্য লড়াই করবে। আসলেই ও ওটা হতে চাইত!

ইতিহাসের পর আমাদের অংক ক্লাস ছিল, এবং অবিশ্বাস্য ভাবে তৃতীয়বারের মত সেটাও পড়াতে এলেন ডাল্টন স্যার! আমাদের অঙ্কের শিক্ষক অসুস্থ হয়ে স্কুলে আসতে পারছিলেন না, সুতরাং অন্যান্য শিক্ষকরা যে যখন পারতেন, উনার ক্লাসগুলো ভাগ করে নিয়ে নিতেন।

স্টীভ তো খুশীতে স্বর্গের সাত-তলায়! পর পর তিনটা ক্লাস তার প্রিয় শিক্ষকের! এই প্রথম ডাল্টন স্যার আমাদের অংক ক্লাস নিলেন। স্টীভের ‘ভাব’ আর দেখে কে! আমরা বইয়ের কোথায় আছি, কঠিন অংকগুলো কি ভাবে করতে হবে, স্টীভ এগুলো স্যারকে এমন ভাবে দেখিয়ে দিচ্ছিল যেন কোন বাচ্চা ছেলেকে শেক্ষাচ্ছে। কিন্তু মনে হল স্যার তাতে কিছু মনে করেন নি। তিনি স্টীভকে ভাল ভাবেই বুঝতেন, আর এ ও বুঝতেন ওকে কি ভাবে বশে রাখা যায়।

সাধারনত ডাল্টন স্যার ক্লাসে বেশ কড়া হলেও মজা করে পড়াতেন এবং আমরা সব সময়ই নতুন কিছু না কিছু শিখতাম। কিন্তু তিনি অংকে ভাল ছিলেন না। আমাদের অংক বোঝানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন কিন্তু আমরা বুঝতে পারছিলাম যে সমস্ত অংক উনার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। অংক বইয়ে মুখ গুঁজে তিনি যখন অংক বোঝার চেষ্টা করছেন আর পাশ থেকে স্টীভ উপদেশ দিচ্ছে, তখন আমরা অন্যরা অস্থির হয়ে ফিসফিস করছিলাম এবং পুরোদমে নোট চালাচালি শুরু করে দিলাম।

আমি এলানকে একটি নোট পাঠিয়ে জানতে চাইলাম, ওই রহস্যময় কাগজ সে কোথা থেকে যোগাড় করেছে। প্রথমে কিন্তু ও এ ব্যপারে আমাকে কোন কিছু লিখতে চাইলো না, কিন্তু আমি বারবার নোট পাঠানোতে অগত্যা হার মানল। টমি ওর দুই সীট পরে বসেছিল সুতরাং টমিই প্রথমে কাগজটা পেলো এবং খুলে পড়া শুরু করে দিল। আমি দেখলাম প্রথমে ওর মুখ উজ্জ্বল হয়ে, পরে ধীরে ধীরে মুখ পুরো হা হয়ে গেল। তিনবার পড়ার পর ও যখন আমাকে দিল, তখন কারনটা বুঝতে পারলাম।

ওটা ছিল একটি ফ্লায়ার। কোন একটা ভ্রাম্যমান সার্কাস দলের বিজ্ঞাপনী প্রচারপত্র, যেটার সবচেয়ে উপরে একটি নেকড়ে বাঘের মুখের ছবি- বিরাট হা’র ভিতর দা্ঁত, আর তা থেকে লালা ঝরছে। সবচেয়ে নিচে একটি মাকড়শা এবং একটি সাপের ছবি ছিল, এবং ওগুলোও দেখতে ভয়ংকর।

নেকড়ের ঠিক নীচে লাল অক্ষরে বড় বড় লেখাঃ

সার্ক দু ফ্রিক

আর তার ঠিক নীচে ছোট করে লেখা,

শুধু মাত্র এক সপ্তাহের জন্য! সার্ক দু ফ্রিক!

দেখুন:
সিভ এবং সীরসা – প্যাঁচানো জমজ!
সর্প-বালক! নেকড়ে-মানুষ! গার্থা টীথ!
লার্টেন ক্রেপ্সলি এবং তার অভিনব মাকড়শা!
ম্যাডাম অক্টা! আলেকজান্ডার রিবস্! দাড়িওয়ালা মহিলা!
হ্যান্স হ্যান্ডস! রেমাস টুবেলিস-বিশ্বের সবচেয়ে মোটা মানুষ!

আর এই সব লেখার নীচে একটা ঠিকানা দেয়া যেখান থেকে টিকেট কেনা যাবে। প্রদর্শনী স্থানের ঠিকানাও ওখানে দেয়া ছিল। এবং নীচে যেখানে সাপ এবং মাকড়শার ছবি, তার ঠিক উপরে লেখা:

দুর্বল মনের মানুষের জন্য নয়! বিধি নিষেধ প্রযোজ্য!

‘সার্ক দু ফ্রিক?’ আমি বিড় বিড় করে বললাম। সার্ক হল সার্কাসের ফ্রেঞ্চ…ফ্রিকের সার্কাস …এটা কি একটা অস্বাভাবিক মানুষদের প্রদর্শনী? দেখে তো তাই মনে হচ্ছে!

আমি আর একবার ফ্লায়ারটা পড়া শুরু করলাম। সার্কাস খেলোয়ারদের ছবি এবং বনর্নায় বুঁদ হয়ে ছিলাম। সত্যি বলতে কি, এতটাই মগ্ন হয়ে ছিলাম যে ক্লাসে স্যারের উপস্থিতির কথা একেবারেই ভুলে গেছিলাম। আমার তখনই স্যারের কথা মনে পড়লো যখন দেখলাম সমস্ত রুম চুপ। মাথা তুলে তাকিয়ে দেখি ক্লাসে্র একেবারে সামনে স্টীভ একা দাঁড়িয়ে। আমার দিকে তাকিয়ে জিভ বের করে দাঁত কেলিয়ে হাসছে। আর তারপরই আমার ঘাড়ের কাছের লোম দাঁড়িয়ে যেতে আমি ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখি স্যার এতক্ষন আমার পিছনে দাঁড়িয়ে চুপ করে ফ্লায়ারটা পড়ছিলেন।

আমার হাত থেকে কাগজটা প্রায় কেড়ে নিতে নিতে বললেন, ‘কি এটা’?

-এটা প্রচারপত্র, স্যার।

-পাইছিস কোথায়? দেখে মনে হচ্ছিল তিনি প্রচন্ড রেগে গিয়েছেন। উনাকে আগে কখনোই এতটা রাগতে দেখিনি।

-কোথায় পাইছিস? তিনি আবারও জিজ্ঞাসা করলেন।

ভয়ে ঠোঁট কামড়ালাম। বুঝতে পারছিলাম না কি উত্তর দেবো। আমি মরে গেলেও এলানের নাম বলব না, আর এটাও জানি এলানও নিজে থেকে কখনোই স্বীকার করবেনা। আমরা, এলানের সবচেয়ে কাছের বন্ধুরা জানি যে এলান কতটা ভীতু। কিন্তু আমার মাথা ভয়ে ঠিকমত কাজ করছিলনা তাই চট করে একটা মোক্ষম মিথ্যা বানাতে পারছিলামনা।

ভাগ্যক্রমে স্টীভ হাল ধরল, ‘স্যার, ওটা আমার’।

স্যার চোখ পিট পিট করে বললেন, ‘তোর’?

-বাস স্ট্যান্ডের কাছে পাইছি স্যার, একটা বুড়া লোক ফেলে দিয়েছিল। কি আছে দেখার জন্য তুলে এনেছি। ক্লাস শেষে এইটা সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম।

-ওহ্ তাই!

স্যার খুশী-খুশী ভাব চেপে রাখার চেষ্টা করলেও আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম যে তিনি মনে মনে ঠিকই খুশী হয়েছেন।

-তা হলে তো অন্য কথা। জানার ইচ্ছে থাকা ভাল। যা, বস।

স্টীভ বসল আর ডাল্টন স্যার ফ্লায়া্রটাকে একটা থাম্বট্যাক দিয়ে বুলেটিন বোর্ডে গেঁথে রাখলেন।
ফ্লায়ারটার উপর টোকা দিতে দিতে বললেন, ‘অনেক আগে, আসল ফ্রিক প্রদর্শনী হত। ঠগ, লোভী লোকরা বিকলাঙ্গ মানুষদেরকে খাঁচায় ভরে রাখত…’

-স্যার, বিকলাঙ্গ মানুষ মানে কি? কে যেন প্রশ্ন করল।

-যেমন কোনো একজন মানুষ যে দেখতে অন্য আট-দশজন সাধারন মানুষের মত না। যেমন তিন হাত অথবা দুই নাকওয়ালা মানুষ; পা নাই এমন কেউ; খুব খাট বা খুব লম্বা মানুষ। ঠগরা এই সব মানুষদেরকে খাচায় পুরে অন্য সাধারন মানুষদেরকে দেখাতো এবং বলতো ওরা নাকি ‘ফ্রিক’, অর্থাৎ উদ্ভট। অথচ এদের এই শারীরিক ত্রুটি বাদে সবই আমাদের মত। ঠগরা এই সব ‘বিকলাংগ মানুষ বা ফ্রিকদের দেখিয়ে সাধারন মানুষদের কাছ থেকে পয়সা নিত। ফ্রিকদের নিয়ে ঠাট্টা করতে দিত। ওরা ফ্রিকদের সাথে পশুর মত ব্যাবহার করতো। খুব অল্প পয়সা দিত, মারত, ছেঁড়া কাপড়ে পরতে দিত আর গোসল করার অনুমতিও দিত না।

-কি নিষ্ঠুর! সামনের দিকে বসা ডেলাইনা প্রাইস নামের মেয়েটা বলে উঠল।

-হ্যাঁ। ফ্রিক শো খুব নিষ্ঠুর এবং জঘন্য প্রদর্শনী। তাই এটা দেখে রেগে গেছিলাম।

ফ্লায়ারটা ছিড়ে ফেলতে ফেলতে বললেন। ‘ফ্রিক প্রদর্শনী অনেক বছর আগে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কিন্তু প্রায়ই গুজবে শোনা যায় যে এখনও ওরা তৎপর আছে’।

-আপনি কি মনে করেন যে সার্ক দু ফ্রিক আসলেই ফ্রিক শো? আমার জিজ্ঞেস করলাম।

স্যার আবার ফ্লায়ারটা পড়লেন। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘মনে হয় না, এটা সম্ভবত একটা বাজে ধরনের চালাকি’। কিছু থেমে আবার বললেন ‘আর যদি সত্যিই হয়… আমি আশা করি আমাদের মাঝে কেউ এটা দেখতে যাওয়ার চিন্তা করবে না।’

-না স্যার, না। আমরা সবাই বেশ তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম।

-কারণ ফ্রিক শো খুবই অমানবিক। ওরা আসল সার্কাসের মত হবে বলে ভাব ধরলেও, আসলে শয়তানীর আড্ডা। আর যারা ওখানে যায়, তারাও ওদের মতই খারাপ।

স্টীভ বলে উঠল- ‘ওখানে শুধু প্রচন্ডরকম বিকৃ্ত মানসিকতার মানুষরাই যেতে পারে।’

আর তারপর আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে ইশারায় বললঃ ‘আমরা যাচ্ছি!’

চলবে…

Advertisements

This is the beginning of the project that I christen: “Translate the AwesYumm”. If you do not read Bangla, read “Cirque du Freak – A Living Nightmare” in English. Various introductions (yes, many introductions) in Bangla follow.

.

.

.

লেখক পরিচিতিঃ
ড্যারেন শ্যান একজন আইরিশ লেখক। জন্ম ২রা জুলাই ১৯৭২ সালে লন্ডনে। ড্যারেন শ্যান তাঁর ছদ্ম নাম। আসল নাম Darren O’Shaughnessy। তিনি লন্ডনের রোহাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী এবং সমাজ বিজ্ঞানে ডিগ্রী লাভ করেন।

তিনি ১৪ বছর বয়সে প্রথম টাইপ রাইটার কিনে লেখা শুরু করেন, ১৫ বছর বয়সে টিভি স্ক্রিপট লেখা প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন এবং ১৭ বছর বয়সে প্রথম নভেল (অপ্রকাশিত) লেখেন। শিশুদের জন্য লেখা তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় সিরিজ, ‘সাগা অফ ড্যারেন শ্যা্ন’ জানুয়ারী ২০০০ সালে প্রকাশিত হয়।এই সিরিজের সবথেকে জনপ্রিয় ট্রাইলজি ‘দ্যা ভ্যাম্পায়ারস এসিস্ট্যান্ট’। আমার অনুবাদের জন্য নির্বাচিত গল্পটি এই ট্রাইলজির প্রথম বই।

তাঁর লেখা ভ্যাম্পায়ার চরিত্র নিয়ে জাপানিজ শিল্পী তাকাহিরো আরাই সফল ভাবে জাপানিজ কার্টুনের বই, মাংগা, তৈরী করেন (নামঃ সার্ক দু ফ্রিক)। প্রথমে এটা জাপানের জন্য নির্মিত হলেও এখন আমেরিকা, যুক্তরাজ্য সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয়। ২০১০ সালের মধ্যে তার বই বিশ্বের প্রায় ৩৯টি দেশে ৩১টি ভাষায় প্রকাশিত হয়। তাঁর কিশোর সাহিত্য আমেরিকা, ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, নরওয়ে এবং বিশ্বের অন্য আরো অনেক দেশেই বেস্ট সেলার।

সার্ক দু ফ্রিকঃ দ্যা ভ্যাম্পায়ারস এসিস্টেন্ট মুভিটি, এই বই থেকেই করা।


আমার কথাঃ

ছোট বেলায় গল্পের বই পড়তে গেলেই অল্প কিছু বইয়ের মাঝে নিজেকে সীমিত রাখতে হত। ঠাকুরমার ঝুলির সব রসদ শেষ হবার পর শুকুমার রায়ের শিশু সাহিত্য সঙ্কলন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের শিশু সমগ্র শেষ করে দেখি, খুব বেশি হলে হুমায়ুন আহমেদ অথবা জাফর ইকবালের কিছু বই। এর বাইরে বেশীর ভাগই ছিল বড়দের প্রেমের উপন্যাস, অথবা এমন বিষয়-বস্তু নিয়ে লেখা, যাতে কিশোরী-উৎসাহ অতি অল্পেই ধুলিস্যাত হোত। মনে আছে ক্লাশ সিক্স-সেভেনে থাকতে, পড়ার কিছু খুঁজে না পেয়ে বাসার পুরোনো বিসিএস গাইডের রচনা এবং ইতিহাস সেকশনও পড়েছি।

কিছুটা বড় হবার পর আবার যখন ইংরেজী ফ্যান্টাসী গল্প পড়া শুরু করলাম, মনে হল যে আসলেই জিনিষটা ভালো। হ্যা, ক্রনিকল অফ নার্নিয়া এবং হ্যারি পটারের কথা বলছি। ইচ্ছে ছিল সেগুলোর কিছু অনুবাদ করার। বিধি বাম। প্রচুর পড়ার চাপ এবং ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির ধান্দায় সমস্ত ইচ্ছা মাঠে মারা পড়ে।

অল্প ক’দিন আগে একগাদা ফ্যান্টাসী ই-বুক হাতে আসে এবং “সার্ক দ্যু ফ্রিক” নামটা ভালো লাগে। গল্প পড়ে দেখি, বাংলায় যেমন বই পড়তে চাইতাম, ঠিক তেমন বই। পড়তে পড়তে নিজেকেই ‘ড্যারেন’ ভাবতে শুরু করেছিলাম। মনে পড়ল ছোটবেলার কথা।

আমার এই অনুবাদ ক্ষুদে গল্প পড়ুয়াদের উপহার দিতে চাই। এই গল্পের প্রোটাগনিস্ট ঠিক ওদের মতনই কিশোর, এবং গল্পটা সহজ এবং অনাড়ম্বর ভাষায় ঠিক ওদের মত করে লেখা।

অনুবাদ শুরু করলাম। পড়ার চাপে খুব দ্রুত না এগোতে পারলেও, পিচ্চি-পাচ্চা পড়ুয়াদের জন্য খুব তাড়াতাড়ি এই বইটি বাংলায় অনুবাদের কাজ শেষ করতে চাই।

.

.

.

একটি জিবন্ত দুঃস্বপ্ন
মুল গল্পঃ ড্যারেন শ্যান

ভুমিকা

মাকড়শাদের প্রতি সবসময়ই আমার একটা প্রবল আকর্ষন ছিল। ছোটবেলায় আমি মাকড়শা সংগ্রহ করতাম। বাগানের পেছন দিকের পুরনো ধুলো জমা ছাউনীর নিচে এই সব আট পেয়ো শিকারীদের ধরার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে মাকড়শাদের জাল ঘাটাঘাটি করতাম। কোন একটাকে খুঁজে পেলেই ধরে এনে আমার ঘরে ছেড়ে দিতাম।

এতে আমার মা ভীষন খাপ্পা হয়ে থাকতেন।

সাধারণতঃ মাকড়শারা দু’এক দিনের মধ্যেই পালিয়ে যেত এবং তারপর আর কখনই তাদের দেখা মিলত না। কিন্তু কখনো কখনো দু’একটা বেশী দিনও থেকে যেত। একবার একটা মাকড়শা আমার বিছানার ঠিক উপরে জাল বুনে সেখানে প্রায় এক মাস চুপচাপ বসে ছিল। ঘুমাতে গিয়ে আমি প্রায়ই কল্পনা করতাম মাকড়শাটা ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসছে, আমার মুখের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে, গলা দিয়ে পিছলে নেমে পেটের মধ্যে ডিম পাড়ছে। কিছুদিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা মাকড়শারা বের হয়ে আমাকে জিবন্ত ভেতর থেকেই খেতে শুরু করে দিয়েছে।

ছোট বেলায় আমি ভয় পেতে ভীষন ভালোবাসতাম।

আমার যখন নয় বছর বয়স, তখন আব্বু-আম্মু আমাকে এইটা ছোট্ট ট্যারানটুলা দিয়েছিল। যদিও ওটা খুব বড় অথবা বিষাক্ত ছিলনা, কিন্তু সেটা ছিল আমার সারা জিবনে পাওয়া উপহারের মাঝে সেরা। দিনের মধ্যে যতক্ষন জেগে থাকতাম, তার প্রায় পুরোটা সময়ই আমি ওই মাকড়শার সাথে খেলতাম। ছোট পোকা, মাছি এবং তেলাপোকা ধরে এনে খেতে দিতাম-ওকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দিতাম।

তারপর এক দিন। আমি একটা মহা বোকার মত কাজ করলাম। কার্টুনে দেখেছিলাম যে একজনকে ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের ভিতরে টেনে নেয়া হয়েছে, কিন্তু তাতে ঐ চরিত্রের কোন ক্ষতি হয়নি। শুধু ভ্যাকুয়ামের ব্যাগের মধ্য থেকে কোন রকমে বের হওয়ার পর, ধুলা-ময়লায় রেগেমেগে তার এমন অবস্থা হয়েছিল যে দেখে আমি খুব মজা পেয়েছিলাম।

এতটাই মজা পেলাম যে আমি আমার ট্যারান্টুলার সঙ্গে একই কাজ করলাম।

বলাই বাহুল্য যে আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা খুব একটা কার্টুনের মত হয়নি। মাকড়শাটা ছিড়ে টুকরা টুকরা হয়েছিল। অনেক কেঁদেছিলাম, কিন্তু সবই বৃথা। আমার পোষা মাকড়শাটা আমারই ভুলের জন্য প্রান হারাল আর আমার কিছুই করার ছিল না!

আব্বু-আম্মু আমার কৃতকর্মে রেগে বাড়ী মাথায় তুলেছিল কারন ওটা বেশ দামি ছিল। আমাকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলেও বকা দিয়েছিল এবং তারপর থেকে ওরা আমাকে পোষার জন্য কিচ্ছু কিনে দেয় নি। এমনকি সাধারণ গোছের মাকড়শাও না!

আমি দুই কারণে এই গল্পটা শেষ থেকে বলা শুরু করেছি। প্রথম কারনটা পড়তে পড়তেই বুঝতে পারবে। এবং অন্য কারনটা হল:

এটা একটি সত্যি গল্প।

তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে, এই আশা আমি করছি না-আমি নিজেও বিশ্বাস করতাম না যদি না এই গল্পটা আমার নিজের জীবনে ঘটত। এই বইয়ে যা লিখেছি তা সব ঘটেছে-একদম যেভাবে লিখেছি, ঠিক তেমন করেই।

বাস্তব জীবন এমন- বোকার মত কাজ করলে, সাধারনতঃ তার মুল্য দিতে হয়। গল্প অথবা বইয়ের নায়কেরা ইচ্ছেমন যতবার খুশী ভুল করতে পারে। কি করল সেটা কোন বিষয়ই না, কারন শেষে গিয়ে সব কিছু ঠিক হয়ে যায়। নায়করা খারাপ লোকদেরকে হারাবেই, সবকিছু ঠিক করে দেবে আর শেষটা হবে জোস।

বাস্তব জীবনে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে মাকড়শা টেনে নিলে তা মারা যায়। ব্যস্ত রাস্তা না দেখে পার হতে গেলে, গাড়ি ধাক্কা দেয়।গাছ থেকে পড়লে হাড়গোড় ভাংগে।

বাস্তবতা জঘন্য এবং নিষ্ঠুর। নায়ক অথবা সুন্দর সমাপ্তি কিম্বা সব কিছু কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে চিন্তা করে না। বাস্তব জীবনে খারাপ জিনিস ঘটে, মানুষ মারা যায়। লড়াইয়ে হার হয়। মন্দ লোকেরা প্রায়শই জিতে যায়।

আমি গল্পটা শুরুর আগে এই বিষয়টা পরিস্কার করতে চেয়েছিলাম।

আর একটি বিষয়ঃ আমার আসল নাম ড্যাররেন শ্যান নয়। এই গল্পে সবকিছু সত্যি শুধু মাত্র নাম ছাড়া, আমাকে ইচ্ছে করেই তাদের নাম পরিবর্তন করতে হয়েছে কারন…ঠিক আছে, তুমি গল্পের শেষে গেলে নিজেই বুঝতে পারবে।

আমি একটাও আসল নাম ব্যাবহার করিনি, না আমার নিজের, না আমার বোনের, না আমার বন্ধুদের না, আমার টিচারদের। কারোর ই না। এমনকি আমি আমার নিজের শহরের বা দেশের নামও বলব না। বলার সহস আমার নেই।

যা ই হোক, ভূমিকার জন্য এ টুকুই যথেষ্ট। যদি তোমরা তৈরি থাকো, চলো শুরু করা যাক।যদি এটা বানানো গল্প হত, তাহলে এর শুরুটা হতো এক ঝড়ের রাতে, পেচার ডাক এবং খাটের নীচে ভয় জাগানিয়া ভুতুড়ে শব্দ নিয়ে।কিন্তু এটা একটি আসল গল্প, তাই আসল শুরুটা দিয়েই শুরু করতে হবে।

গল্পের শুরুটা টয়লেটে।

চলবে…